বৃহস্পতিবার, ৮ ডিসেম্বর ২০২২ | ২৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৯ বঙ্গাব্দ

ড. বেনজীর আহমেদকে যে প্রশ্ন করা যায়

ড. মারুফ মল্লিক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক
১৩ অক্টোবর ২০২২ ০৮:৫৬ |আপডেট : ১৩ অক্টোবর ২০২২ ২৩:০১
পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক বেনজীর আহমেদ। ফাইল ছবি
পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক বেনজীর আহমেদ। ফাইল ছবি

বেনজীর সরকারি কর্মচারী হয়েও দম্ভ ভরে রাজনৈতিক দলের উদ্দেশ্যে বলেছেন, ‘আপনারা কারা?’ এখন যদি জনসাধারণ প্রশ্ন করে, রাষ্ট্রের কর্মচারী হয়ে, জনসাধারণের করের অর্থে জীবনযাপন করে রাজনৈতিক বক্তব্য দেওয়ার আপনি কে? আপনি যে জীবন-যাপন করছেন সেই অর্থের উৎস কোথায়? মানবাধিকার লঙ্ঘনের অধিকার আপনাকে কে দিল? আপনি কে?

নিষেধাজ্ঞার খড়্গ মাথায় নিয়েই অবসরে গেলেন পুলিশের সদ্য সাবেক মহাপরিদর্শক বেনজীর আহমেদ। এদিক থেকে বেনজিরের বিদায় খুব বেশি সুখকর বলা যাবে না। তাঁর পূর্ববর্তী মহাপরিদর্শকদের কয়েকজন রাষ্ট্রদূত হিসাবে বিদেশে চাকরি করেছেন। নিষেধাজ্ঞার কারণে বেনজীরকে এ ধরনের নিয়োগ দেওয়া সরকারের জন্য কঠিন হবে। আবার দেশের ভেতরেও তাঁকে চুক্তি ভিত্তিক নিয়োগ দেওয়া সহজ হবে না। কোনো প্রতিষ্ঠানে নিয়োগ দেওয়া হলে আন্তর্জাতিক যোগাযোগের প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হতে পারে নিষেধাজ্ঞার কারণে।

প্রশ্ন হচ্ছে, সরকারের পক্ষ নিয়ে বিরোধী মতের ওপর কঠোর অবস্থান গ্রহণ এবং গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যার অভিযোগে অভিযুক্ত বেনজীর আহমেদের ভাগ্যে রইল কী? তিনি এখন আনুষ্ঠানিকভাবে আওয়ামী লীগে যোগদান করতে পারেন। কিন্তু আওয়ামী লীগ কি নিষেধাজ্ঞার দায়ভার নিজেদের কাঁধ নিবে? যদি না নেয় তবে আপাতত সরকারি নিরাপত্তার ঘেরাটোপে জীবনযাপন করাই বেনজীরের নিয়তি। কারণ আলোচিত, সমালোচিত, বিতর্কিত ও নিন্দিত এই পুলিশ কর্মকর্তার অবসরকালীন সময়ে বিশেষ নিরাপত্তার ব্যবস্থা করতে হয়েছে সরকারকে। পুলিশের একটি গাড়ি ও সাদা পোশাকের ছয়জন পুলিশ তাকে নিরাপত্তা দেবে বলে গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদে বলা হয়েছে। এ ছাড়াও তিনি দুজন সশস্ত্র পুলিশ ও বাড়িতে তিনজন পুলিশের নিরাপত্তা পাবেন।

ইতিপূর্বে অবসরে যাওয়া অন্য কোনো পুলিশ মহাপরিদর্শকের জন্য এই ধরনের বিশেষ নিরাপত্তার বিষয়টি দেখা যায়নি। বিতর্কিত র‍্যাবের মহাপরিচালক হিসাবে দায়িত্বপালন কারণে মানবাধিকার লঙ্ঘনের দায়ে তিনি মার্কিন নিষেধাজ্ঞা প্রাপ্ত হন। র‍্যাব ও পুলিশের দায়িত্ব পালন কারণে এই দুইটি প্রতিষ্ঠানের নির্মমতার জন্য তিনি সব সময়ই তীব্রভাবে নিন্দিত হয়েছে।

সমালোচিত এই কর্মকর্তার পুলিশ ও র‍্যাবের শীর্ষ দায়িত্ব পালনকালে গুম ও বিনা বিচারে হত্যার মতো মানবতাবিরোধী বিভিন্ন অপরাধে পুলিশ ও র‍্যাবের সদস্যরা ব্যাপকভাবে জড়িয়ে পড়েন বলে মানবাধিকার সংস্থাগুলো অভিযোগ করেছে। এ ছাড়া ছিনতাই, আটক করে অর্থ আদায়সহ নানা অপরাধেও আইনশৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা ব্যাপকভাবে জড়িয়ে পড়েন বলে বিরোধী মতের দলগুলোর পক্ষ থেকে অভিযোগ রয়েছে।   

মূলত বেনজীর আহমেদ যখন নেতৃত্বে ছিলেন তখনই পুলিশ ও র‍্যাবের বিরুদ্ধে ভয়ংকর নানা অভিযোগ উঠতে থাকে। এই সময় আমরা বিরোধী দলের দমন-নিপীড়নের ঘটনা ঘটেছে অব্যাহতভাবে। কিছুদিন আগেই নারায়ণগঞ্জে মিছিলে চাইনিজ অটোমেটিক রাইফেল দিয়ে গুলি করে বিএনপির এক কর্মীকে হত্যা করে গোয়েন্দা পুলিশের এক কর্মকর্তা। ওই কর্মকর্তার গুলি করার দৃশ্য গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। শুধু নারায়ণগঞ্জেই নয়, ভোলা, মুন্সিগঞ্জে সম্প্রতি পুলিশ গুলি করে বিরোধী কর্মীদের হত্যা করেছে। গুলি করে হত্যার অভিযোগ ছাড়াও র‍্যাব ও পুলিশের নির্যাতনের কারণে বিরোধী নেতা-কর্মীরা পঙ্গু হয়েছেন এমন অনেক অভিযোগও আছে।

পুলিশ ও র‍্যাবকে ব্যবহার করে বিরোধী রাজনীতিকে কঠোরভাবে দমন, রাজনৈতিক নেতা-কর্মীদের ওপর নৃশংসতার ও নিপীড়নের পাশাপাশি বেনজীর আহমেদ প্রকাশ্যে রাজনৈতিক বক্তব্য দিয়ে বিতর্কিত হয়েছেন। চলতি বছরের মার্চে বিএনপির সমালোচনা করে চরমভাবে সমালোচিত হন বেনজীর আহমেদ। পুলিশ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশনের স্বাধীনতা দিবসের অনুষ্ঠানে বেনজীর আহমেদ বলেন, দেশের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করা হচ্ছে। দেশের অর্থনীতির ওপর অবরোধ জারি করতে একটি রাজনৈতিক দলের নেতারা লবিস্ট নিয়োগ করেছে। জিএসপি বন্ধ করতে চিঠি লিখেছে। ওই অনুষ্ঠানে বেনজীর রীতিমতো হুংকার দিয়ে বলেন, হু আর ইউ? আপনারা কারা? বেনজীর আহমেদের এই রাজনৈতিক নেতাসুলভ চর্চা অন্যান্য পুলিশ কর্মকর্তাদের মধ্যেও সংক্রমিত হয়েছে। ওই একই অনুষ্ঠানে আরেক পুলিশ কর্মকর্তা শাফিকুল ইসলাম নাম উল্লেখ না করে খালেদা জিয়াকে নিয়ে অত্যন্ত কুৎসিত মন্তব্য করেছিলেন। শফিকুল বলেন, যাকে তার স্বামী পরিত্যাগ করেছিল.........সে পাকিস্তানের ওখানে কী করছে। সে নাকি এখন এক নম্বর মুক্তিযোদ্ধা।

মূলত খালেদা জিয়াকে এক নম্বর মুক্তিযোদ্ধা দাবি করে বক্তব্য দিয়েছিলেন বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। এটা রাজনৈতিক বক্তব্য। রাজনৈতিক বক্তব্যের উত্তর দেবে রাজনৈতিক দলগুলো। কিন্তু রাষ্ট্রের কর্মচারীদের রাজনৈতিক বিতর্কে জড়িয়ে পড়া স্পষ্টতই এক অশনিসংকেত দেশ ও জাতির জন্য। এর আগে জনতার মঞ্চে যোগ দিয়ে প্রশাসনকে বিপথগামী করেছিলেন মহিউদ্দিন খান আলমগীরের মতো আমলারা।

বেনজীর আহমেদ পুলিশের অন্য কর্মকর্তাদের নিয়েই সদলবলে রাজনৈতিক বিতর্কে জড়িয়ে পুলিশকে বিতর্কিত করার কাজটি শুরু করেছেন। মাঝে মাঝে তার বক্তব্য শুনে মনে হতো আওয়ামী লীগ নেতার কথা শুনছি যেন। সম্প্রতি নিউইয়র্কে যুক্তরাষ্ট্র আওয়ামী লীগের নেতা হিন্দাল কাদির বাপ্পার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এক নাগরিক সংবর্ধনায়ও তিনি রাজনৈতিক নেতার মতোই বক্তব্য দিয়েছেন। এটা সরাসরি প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীদের আচরণবিধির লঙ্ঘন। পুলিশের পোশাক গায়ে এ ধরনের আচরণ রাষ্ট্রের নিরাপত্তাকে ঝুঁকির মুখে ফেলে দেয়। কর্মচারীদের বিশৃঙ্খল হতে উসকানি দেয়। নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের মধ্যে পারস্পরিক আস্থা কমিয়ে দেয়

বেনজীর আহমেদের ক্ষেত্রেও শেষ দিকে তাই হয়েছে। পুলিশ বাহিনীর মধ্যেই তিনি একাংশের বিরোধিতার মুখে পড়েছিলেন। এর মধ্যে সরকার সমর্থক পুলিশ অফিসাররাই ছিলেন। রাজনৈতিক বক্তব্য দিয়ে বেনজির নিজে সরকারের আনুকূল্য লাভে সচেষ্ট ছিলেন। কিন্তু বেনজীরের পাশাপাশি এখন অন্যান্য কর্মকর্তারাও একই চেষ্টা করছেন। ফলে বেনজীর বিরোধী পক্ষের পাশাপাশি সরকার সমর্থক কর্মকর্তাদেরও বিরোধিতার মুখোমুখি হয়েছিলেন। সম্ভবত এ কারণেই সামনে নির্বাচন থাকলেও সরকার তাকে চুক্তিতে আরও কিছু সময় পুলিশের মহাপরিদর্শক পদে রাখতে পারেনি। অবশ্য নিষেধাজ্ঞা প্রাপ্ত আরেকজনকে মহাপরিদর্শক হিসাবে নিয়োগ দিয়েছে।

বেনজীর সরকারি কর্মচারী হয়েও দম্ভ ভরে রাজনৈতিক দলের উদ্দেশ্যে বলেছেন, ‘আপনারা কারা?’ এখন যদি জনসাধারণ প্রশ্ন করে, রাষ্ট্রের কর্মচারী হয়ে, জনসাধারণের করের অর্থে জীবনযাপন করে রাজনৈতিক বক্তব্য দেওয়ার আপনি কে? আপনি যে জীবন-যাপন করছেন সেই অর্থের উৎস কোথায়? মানবাধিকার লঙ্ঘনের অধিকার আপনাকে কে দিল? আপনি কে?

রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার ঘেরাটোপে কত দিন?

 

ড. মারুফ মল্লিক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক



মন্তব্য করুন