রবিবার, ১৪ জুলাই ২০২৪ | ৩০ আষাঢ় ১৪৩১ বঙ্গাব্দ

তারেক রহমান ও বিএনপি কি আইন আদালতের ঊর্ধ্বে?

নিজস্ব প্রতিবেদক
২৬ জুলাই ২০২৩ ১৩:০৮ |আপডেট : ২৭ জুলাই ২০২৩ ০৯:৩০
আপিল বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিক
আপিল বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিক

অনেকেই জিজ্ঞেস করতে পারেন আমার মনে এমন প্রশ্ন কেন জাগল? এর পেছনে অনেক কারণ রয়েছে বলেই এ প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে আমার চিন্তা জগতে। প্রকাশ্য দিবালোকেই দেখতে পাচ্ছি কিছু রাজনৈতিক নেতা-কর্মী একের পর এক অপরাধ করে যাচ্ছে, অথচ আইনের লম্বা হাত তাদের স্পর্শ করতে পারছে না। তাদের কৃত অনেক অপরাধ গুরুতর বৈকি।

আইনের ছাত্র হিসেবে প্রথম দিনটিই জানতে হয়েছিল যে আইনের হাত অনেক লম্বা, আইন অন্ধ, আইন কাউকে ছাড়ে না।

প্রশ্নটি মনে এলে বিশ্বের সর্বকালের শ্রেষ্ঠতম বিচারপতিদের একজন, লর্ড ডেনিংয়ের সেই উক্তিটির কথা মনে পড়ে, যা ছিল এই, তুমি যত বড়ই হও না কেন আইন তোমার চেয়ে বড়। উক্তিটি অবশ্য লর্ড ডেনিংয়ের নয়। এটি প্রথম উল্লেখ করেছিলেন ডা. থমাস ফুলার নামক এক চিকিৎসক, যিনি এটি লিখেছিলেন ১৭৩৩ সালে। ১৯৭৭ সালে লর্ড ডেনিং ডা. ফুলারের সেই অমর মন্তব্য অ্যাটর্নি জেনারেলের মামলায় পুনরোল্লেখ করেছিলেন।

কিন্তু আজকে কিছু বিএনপি-জামায়াত নেতা, পাতিনেতার কথাবার্তা এবং আচার-আচরণ দেখে মনে হচ্ছে তারা আইনের ঊর্ধ্বে। কথাটি বিশেষ করে মনে পড়ল সাম্প্রতিক একটি খবর দেখে, যা থেকে জানা গেল যে খুনের দায়ে যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত, বিলেতে পালিয়ে থাকা আসামি তারেক জিয়া এক জুম আলোচনার মাধ্যমে আমাদের দেশের আইন ব্যবস্থা এবং আদালত সম্বন্ধে এমন সব আপত্তিকর এবং জিঘাংসামূলক কথা উচ্চারণ করেছেন, যা ক্ষমার অযোগ্য। ভাবটা এই যে আদালত যেন তাকে সাজা দিয়ে মহা ভুল করে ফেলেছেন। খুনের দায়ে দণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তি তারেক জিয়া এবং যেসব ব্যক্তি বগুড়ায় থেকে জুম প্ল্যাটফরমের মাধ্যমে যুক্ত হয়ে কথাবার্তা বলেছেন, তারা বেশ কটি অপরাধ করেছেন, আইনের শাসনের স্বার্থে যেগুলোর বিচার হওয়া অপরিহার্য।

খুনি তারেক জিয়া (খুনের অপরাধে যথাযোগ্য আদালত থেকে খুনি সাব্যস্ত এবং দণ্ডপ্রাপ্ত হওয়ায়, তাকে আইনতই খুনি বলা যায়) উল্লিখিত জুম আলোচনায় মহামান্য সর্বোচ্চ আদালতসহ আমাদের সব আদালতকে যেভাবে এবং যে ভাষায়, হিংসাত্মক, প্রতিশোধ এবং জিঘাংসামূলক কটাক্ষ এবং ভাষা দিয়ে আক্রমণ করেছেন, তা আমাদের সংবিধানের ১০৮ অনুচ্ছেদের বিধান অনুযায়ী আদালত অবমাননার দায়ে শাস্তিযোগ্য অপরাধ, যে অপরাধের বিচারের জন্য মহামান্য সুপ্রিম কোর্টের উভয় বিভাগ স্বপ্রণোদিত হয়েও রুল জারি করতে পারেন। অবশ্য আদালত অবমাননাকর তথ্য আদালতের নজরে আনা দরকার, যার জন্য জুমে কথাবার্তার বিষয়টি আদালতে উপস্থাপন করতে হবে। তারেক জিয়া বিদেশে পলাতক রয়েছে বিধায় হয়তো বিচারকালে তাকে তাৎক্ষণিকভাবে ধরা সম্ভব নাও হতে পারে, কিন্তু সে উপস্থিত না থাকলেও তার বিরুদ্ধে মামলা চলতে বা দোষী প্রমাণিত হলে তাকে সাজা প্রদান করতে কোনো বাধা থাকবে না। আদালত অবমাননার অপরাধ যে তারেক জিয়া একাই করেছে তা নয়। যেসব ব্যক্তি জুম প্ল্যাটফরমের মাধ্যমে তারেক জিয়ার অবমাননাকর উক্তি প্রচারে সহায়তা করেছে, তারাও তারেক জিয়ার মতোই আদালত অবমাননার অপরাধে অপরাধী এবং সে কারণে অবমাননার রুল তাদের বিরুদ্ধেও হতে পারে।

তাদেরও বিচার এবং অপরাধ প্রমাণিত হলে শাস্তি হতে পারে।

তারেক জিয়া পলাতক আসামি হওয়ার কারণে মহামান্য হাই কোর্টে এই মর্মে একটি আবেদন করা হয়েছিল যে, তার কোনো বক্তব্য, ভাষণ যেন বাংলাদেশের কোনো মাধ্যমেই প্রচার করা না যায়। প্রয়াত সংসদ সদস্য আবদুল মতিন খসরু, বর্তমানে পশুসম্পদমন্ত্রী শ ম রেজাউল করিম, সংসদ সদস্য এবং প্রাক্তন মন্ত্রী কামরুল হক, সাবেক সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট সানজিদা খাতুন, সাবেক সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল অ্যাডভোকেট ইয়াদিয়া জামানসহ আরও কয়েকজন মহামান্য হাই কোর্টে উক্ত দরখাস্তটি উপস্থাপন করলে হাই কোর্ট এই মর্মে নির্দেশ প্রদান করেছিলেন যে, তারেক জিয়ার কোনো ভাষণ, বক্তব্য, মন্তব্য কোনো প্রক্রিয়ায়, কোনো মাধ্যমে এবং কোনোভাবেই প্রচার করা যাবে না।

উক্ত আদেশ এখনো বলবৎ থাকায় যেসব ব্যক্তি তারেক জিয়ার উল্লিখিত ভাষণ জুম প্ল্যাটফরম মাধ্যমে প্রচারে সহায়তা করেছে, তারা সবাই মহামান্য হাই কোর্টের উক্ত নিষেধাজ্ঞাপূর্ণ আদেশ ভঙ্গের অপরাধে অপরাধী, যার জন্য তাদের সাজা হতে পারে। যারা উঁচু গলায় গণতন্ত্র এবং মানবাধিকারের কথা বলে আকাশ-বাতাস প্রকম্পিত করছেন, তাদের বোঝা উচিত যে আইনের প্রতি শ্রদ্ধা এবং আইনের শাসন হচ্ছে গণতন্ত্রের অপরিহার্য পূর্বশর্ত এবং মানব অধিকার রক্ষায়ও এর বিকল্প নেই।

দুঃখের বিষয় হলো, যেসব মানুষ প্রতিনিয়ত মানবাধিকার গেল, গণতন্ত্র গেল বলে চিৎকার করছেন, খুনি তারেক জিয়ার উল্লিখিত আদালত অবমাননার বক্তব্যের ব্যাপারে তাদের কোনো কথাই শোনা যাচ্ছে না। এটা আশা করা অমূলক হবে না যে, সচেতন মহল ফেরারি আসামি তারেক জিয়ার আপত্তিকর বক্তব্যের বিরুদ্ধে কথা বলে, আইনের শাসন রক্ষায় ভূমিকা রাখবেন। এর ফলে যেসব অপরাধী সাজা থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য বিদেশে পালিয়ে যাওয়ার কথা চিন্তা করে, তারা সে ধরনের সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে কয়েকবার ভেবে দেখবে।

মনে রাখতে হবে যে, যারা তারেক জিয়ার বক্তব্য প্রচারে সহায়তা করছে, তারা একজন পলাতক আসামিকেই পালিয়ে থাকতে উৎসাহিত করছে। এ ছাড়াও যারা তারেক জিয়ার এহেন অপরাধমূলক কার্যকলাপ দেখেও নীরবতা অবলম্বন করছেন, তারাও পরোক্ষভাবে এবং সম্ভবত নিজেদের অজান্তেই তারেক জিয়াকে উৎসাহিত করছেন। এটা আশা করা অমূলক হবে না যে, দেশের সচেতন ব্যক্তিরা তারেক জিয়ার অপরাধের বিরুদ্ধে সোচ্চার হবেন। এটাও আশা করা যায় যে, কোনো বিজ্ঞ অ্যাডভোকেট/অ্যাডভোকেটরা বিষয়টি মহামান্য হাই কোর্টের নজরে আনবেন যেন সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে যথাযোগ্য আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা যায়। মনে রাখতে হবে যে, আদালতের মর্যাদা রক্ষা করা গণতন্ত্র, আইনের শাসন এবং মানবাধিকার রক্ষার জন্য অপরিহার্য পূর্বশর্ত। আদালতের মর্যাদা এবং কর্তৃত্ব ভূলুণ্ঠিত হলে গণতন্ত্র বা আইনের শাসন কোনোটিই টিকতে পারে না। আর এ জন্যই পৃথিবীর সব দেশেই আদালতের নির্দেশনা এবং মর্যাদা রক্ষার জন্য আইন রয়েছে, যে আইনে অবমাননাকারীদের শাস্তির বিধান রয়েছে।

সেই সঙ্গে এটাও বলা প্রয়োজন, এক্সট্রাডিশন আইনের মাধ্যমে তারেক জিয়াকে ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা ত্বরান্বিত করাও আইনের শাসনের স্বার্থে প্রয়োজন। যারা বলছেন যে, যুক্তরাজ্যের সঙ্গে আমাদের এক্সট্রাডিশন (আসামি প্রত্যর্পণ) চুক্তি নেই বলে তা সম্ভব নয়, তারা সংশ্লিষ্ট আইনটি না জেনেই এ ধরনের কথা বলছেন। কয়েক মাস আগে ঢাকায় নিযুক্ত সাবেক ব্রিটিশ হাইকমিশনারও একই ভুল উক্তি করেছিলেন। ২০০৩ সালের ব্রিটিশ এক্সট্রাডিশন আইন অনুযায়ী যেসব দেশের সঙ্গে চুক্তির প্রয়োজন নেই, বাংলাদেশও সেসব দেশের তালিকায় রয়েছে। একইভাবে ১৯৭৪ সালের বাংলাদেশের এক্সট্রাডিশন আইন অনুযায়ীও কোনো আসামিকে বাংলাদেশ থেকে যুক্তরাজ্যে ফেরত পাঠানো যায়, আর এর জন্য চুক্তির প্রয়োজন নেই।

তারেক জিয়া যে একের পর এক এ ধরনের অপরাধমূলক কার্যকলাপ বিরামহীনভাবে চালিয়ে যাচ্ছে, তা ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষের নজরে আনা প্রয়োজন, যাতে ব্রিটিশ সরকারও তারেক জিয়ার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারে। বেকার তারেক জিয়া কীভাবে যুক্তরাজ্যে বহু কর্মচারী নিয়ে, দামি গাড়ি ব্যবহার করে, অত্যন্ত দামি এলাকায় রাজপ্রাসাদতুল্য বাড়িতে বসবাস করে রাজকীয় জীবনযাপন করছে, সন্তানকে উঁচু বেতন দিয়ে পাবলিক স্কুলে পড়াল, সে কোথা থেকে এত টাকা পাচ্ছে, তার টাকা পাচারের উৎস এবং পদ্ধতি বের করার জন্য কার্যকর তদন্ত অতি প্রয়োজন। যারা দেশ থেকে টাকা পাচার করছে, তারেক জিয়া যে তাদের তালিকার শীর্ষে রয়েছে, তারেক জিয়ার বিলাসবহুল জীবনযাপনই তার বড় প্রমাণ। সুতরাং তার সমস্ত অপরাধ খতিয়ে দেখা জাতি এবং দেশের স্বার্থে অবশ্যম্ভাবী।

 

লেখক : আপিল বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি



মন্তব্য করুন