শনিবার, ২৭ জুন ২০২৬ | ১২ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

প্রশাসনের সংস্কার ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি: জনআকাঙ্ক্ষা পূরণের তাগিদ

অদিতি করিম
২৬ জুন ২০২৬ ১৩:১৯
অদিতি করিম
অদিতি করিম

একটি দেশের উন্নতির প্রধান শর্ত হলো আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন। এই উন্নয়ন নিশ্চিত না হলে দেশের উন্নয়ন কোন ক্রমেই সম্ভব নয়। পৃথিবীর যে সমস্ত দেশ উন্নতির শিখরে উঠেছে যেসব দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি অবশ্যই অতি উত্তম।

আধুনিক মালয়েশিয়ার রূপকার মাহাথির মোহাম্মদ এই বিষয়টির প্রতি অত্যাধিক গুরুত্ব দিয়ে দেশের উন্নয়ন পরিকল্পনায় কাজ শুরু করেছিলেন।

ক্ষমতা গ্রহণের পর তিনি বলেছিলেন, দেশ ও জনগণের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা না গেলে কোনো স্বপ্নই পূরণ সম্ভব নয়। তার বক্তব্য নিয়ে নানামুখী আন্তর্জাতিক সমালোচনা উপেক্ষা করেও তিনি অপরাধ দমনে কঠোর অবস্থান নিয়েছিলেন। যার সুফল আজ মালয়েশিয়ার জনগণ ভোগ করছে।

শুধু মালয়েশিয়া নয়, বিশ্বের যেকোনো উন্নত রাষ্ট্রের অগ্রযাত্রার প্রধান ভিত্তিই হলো টেকসই আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থা, যা দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়ায়। নাগরিকদের জন্য একটি ভয়হীন কর্মপরিবেশ তৈরি করে। বর্তমান বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এই ঐতিহাসিক শিক্ষা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।

২০২৪ সালের জুলাই বিপ্লবের পর এ দেশের ছাত্র-জনতা একটি নিরাপদ, শান্তিময় এবং বৈষম্যহীন বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখেছিল। কিন্তু ৫ আগস্টের পরর্বতী সময়ে দেশ এক ধরনের মব কালচার ও আইনহীনতার মুখে পড়ে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, বিচারালয়, সচিবালয় থেকে শুরু করে শিল্প ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনসর্বত্রই এক ধরনের অস্থিতিশীল পরিবেশ তৈরি হয়, যা জনজীবনকে বিপর্যস্ত করে তোলে এবং দেশের অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।

এই পটভূমিতে, ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে দেশের মানুষ মূলত শান্তি, নিরাপত্তা ও সুশাসনের প্রত্যাশায় বিএনপিকে ম্যান্ডেট দেয়। বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর আইনশৃঙ্খলা রক্ষা ও অপরাধ দমনকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিলেও, পরিস্থিতি এখনো পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়নি। যদিও বিগত তিন মাসে পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি লক্ষ্য করা গেছে, তবে সাম্প্রতিক কিছু পরিসংখ্যান জনমনে আবারও উদ্বেগ বাড়াচ্ছে।

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) এক প্রতিবেদনে দেখা যায়, সরকারের প্রথম ১০০ দিনে অপরাধের গ্রাফ ছিল ঊর্ধ্বমুখী। মার্চ ও এপ্রিলএই দুই মাসেই দেশে ৬০৫টি হত্যাকাণ্ড, ২৯৪টি ছিনতাই, ৯০টি ডাকাতি এবং ১৯৬টি অপহরণের ঘটনা ঘটেছে। একই সময়ে পুলিশের ওপর হামলার ঘটনা ঘটেছে ১২৯টি এবং চুরির ঘটনা রেকর্ড হয়েছে ২ হাজার ২১৪টি। পাশাপাশি নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে ৩ হাজার ৪৯৬টি, যার মধ্যে ধর্ষণের মতো জঘন্য অপরাধও অন্তর্ভুক্ত।

অনুরূপ উদ্বেগ প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ সিভিল রাইটস সোসাইটি (বিসিআরএস)। তাদের তথ্যমতে, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত চার মাসে দেশে ১ হাজার ১৪২টি খুন, ৩৪৭টি অপহরণ, ১৮৪টি ছিনতাই এবং ৫৯১টি ডাকাতির ঘটনা ঘটেছে। এই সময়ে নারী ও শিশু নির্যাতনের মামলা হয়েছে ৫ হাজার ৯৯৮টি। এই পরিসংখ্যানগুলো প্রমাণ করে যে, সার্বিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি এখনো কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় পৌঁছায়নি।

বিশ্লেষকদের মতে, সরকারের আন্তরিক প্রচেষ্টা থাকা সত্ত্বেও পূর্ববর্তী অন্তর্বর্তীকালীন প্রশাসনের রেখে যাওয়া প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা থেকে এখনো পুরোপুরি বের হওয়া সম্ভব হয়নি। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও সিভিল প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ পদে এখনো এমন অনেকে বহাল আছেন, যারা বর্তমান সরকারের নীতি ও লক্ষ্য বাস্তবায়নে আন্তরিক নন।

পাশাপাশি বিচার বিভাগের সংস্কারের গতিও ধীর। সুপ্রিম কোর্ট ও দেশের অধস্তন আদালতগুলোতে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীদের মধ্যে সমন্বয়হীনতা স্পষ্ট। গত ২৩ জুনের একটি ঘটনা এর বড় প্রমাণ, যেখানে আপিল ও হাইকোর্ট বিভাগে কর্মরত ১৮ জন আইন কর্মকর্তা (৭ জন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল এবং ১১ জন সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল) একযোগে পদত্যাগ করেন। এই ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি সরকারকে বিব্রতকর অবস্থায় ফেলছে।

দেশের অর্থনৈতিক সংকট কাটাতে এবং নতুন বিনিয়োগ আকর্ষণ করতে হলে সবার আগে ব্যবসাবান্ধব ও নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে।

অতীতে যারা শিল্প-কারখানায় অগ্নিসংযোগ করেছে, চাঁদাবাজি করেছে কিংবা সাংবাদিকদের ওপর হামলা চালিয়েছে, তাদের রাজনৈতিক পরিচয় বিবেচনা না করে আইনের আওতায় আনা জরুরি। ২৩ জুন ধানমন্ডি ৩২ নম্বরের সামনে সাংবাদিকদের ওপর যে হামলার ঘটনা ঘটেছে, তার সুনির্দিষ্ট বিচার হওয়া প্রয়োজন।


জনগণের বিপুল সমর্থনে গঠিত এই সরকারের কোনো অপরাধী বা স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীকে ভয় পাওয়ার কারণ নেই। অপরাধীর একমাত্র পরিচয় সে অপরাধী। আইনের শাসন ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করতে হলে সরকারকে আরও কঠোর ও নির্মোহ ভূমিকা পালন করতে হবে। কারণ, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির স্থায়ী উন্নতি ছাড়া দেশের কোনো টেকসই উন্নয়ন বা স্বপ্ন বাস্তবায়ন সম্ভব নয়।



মন্তব্য করুন