শনিবার, ১৮ জুলাই ২০২৬ | ৩ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

১৯৭১: স্মৃতির লড়াই এখন নতুন প্রজন্মের হাতে

বিশেষ প্রতিবেদক
১৮ জুলাই ২০২৬ ১৬:৫৫ |আপডেট : ১৮ জুলাই ২০২৬ ১৮:১৩
প্রতীকী ছবি
প্রতীকী ছবি

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ কেবল অতীতের একটি ঘটনা নয়। এটি জাতির পরিচয়, চেতনা ও রাষ্ট্রগঠনের ভিত্তি। তাই মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস নিয়ে বিতর্ক, ব্যাখ্যা কিংবা রাজনৈতিক অবস্থান আজও জাতীয় আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছে।

সংসদ, রাজনৈতিক সমাবেশ, টেলিভিশন বিতর্ক থেকে শুরু করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম—সবখানেই ১৯৭১-এর ইতিহাস নতুন করে আলোচিত হচ্ছে। স্বাধীনতার বহু বছর পরে জন্ম নেওয়া প্রজন্মের কাছেও এটি আর শুধু একটি ঐতিহাসিক অধ্যায় নয়; বরং সত্য, স্মৃতি ও জাতীয় দায়বদ্ধতার প্রশ্ন।

এমন বাস্তবতায় সংসদে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের পক্ষ থেকে শহীদ ও মুক্তিযোদ্ধাদের একটি নির্ভুল ও যাচাইকৃত তালিকা প্রণয়নের অঙ্গীকার বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। এটি কেবল প্রশাসনিক উদ্যোগ নয়, বরং জাতির ইতিহাসকে নির্ভুলভাবে সংরক্ষণের একটি প্রচেষ্টা। সংসদে প্রশ্নোত্তর পর্বে তিনি বলেন, স্বাধীনতার পর প্রকৃত শহীদ ও মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা প্রণয়নের প্রক্রিয়া বিভিন্ন সময়ে রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে বিতর্কিত হয়েছে। তাই প্রকৃত অবদান রাখা ব্যক্তিদের সঠিকভাবে চিহ্নিত করে একটি গ্রহণযোগ্য তালিকা তৈরির ওপর তিনি গুরুত্বারোপ করেন।

যে কোনো রাষ্ট্রের দায়িত্ব তার মুক্তিযোদ্ধা ও শহীদদের যথাযথ স্বীকৃতি দেওয়া। কিন্তু ইতিহাস যখন রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করা হয়, তখন সত্য সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তাই এ উদ্যোগের তাৎপর্য বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় আরও গভীর।

সাম্প্রতিক সময়ে জামায়াতে ইসলামী তাদের ১৯৭১ সালের ভূমিকা নিয়ে নতুন ব্যাখ্যা তুলে ধরার চেষ্টা করেছে। ২০২৪ সালের নভেম্বরে এক টেলিভিশন সাক্ষাৎকারে দলটির আমির ডা. শফিকুর রহমান দাবি করেন, জামায়াত বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরোধিতা করেনি; বরং স্বাধীনতা অর্জনের পদ্ধতি নিয়ে তাদের আপত্তি ছিল। একই সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, অবিভক্ত পাকিস্তান ধরে রাখার প্রশ্নে জামায়াতের অবস্থান বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের অবস্থানের সঙ্গে মিল ছিল।

ডা. শফিকুর রহমান নিজেকে একজন মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের সদস্য বলেও উল্লেখ করেন। একইভাবে চাঁদপুর জেলা জামায়াতের আমির বিল্লাল হোসেন মিয়াজীও দাবি করেন, তিনি মুক্তিযুদ্ধের সমর্থক ছিলেন। ব্যক্তিগত বা পারিবারিক পরিচয়ের ভিত্তিতে কাউকে মূল্যায়ন করা এক বিষয়, কিন্তু একটি রাজনৈতিক দলের অবস্থান নির্ধারিত হয় তার প্রাতিষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত, কর্মকাণ্ড ও ঐতিহাসিক ভূমিকার মাধ্যমে।

এ কারণেই সমালোচকদের বক্তব্য, জামায়াতে ইসলামী এখনো ১৯৭১ সালে তাদের রাজনৈতিক অবস্থানের বিষয়ে স্পষ্ট ও পূর্ণাঙ্গ জবাবদিহি করেনি। ইতিহাসে প্রতিষ্ঠিত তথ্য অনুযায়ী, দলটি বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরোধিতা করেছিল এবং পাকিস্তানের অখণ্ডতা রক্ষার পক্ষে অবস্থান নিয়েছিল। শান্তি কমিটি, রাজাকার, আলবদর ও আলশামসের মতো বাহিনীর সঙ্গে দলটির বহু নেতা-কর্মীর সম্পৃক্ততার অভিযোগ দীর্ঘদিন ধরেই আলোচিত। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে এসব সহযোগী বাহিনীর বিরুদ্ধে বুদ্ধিজীবী হত্যা, সাধারণ মানুষের ওপর নির্যাতন, ধর্ষণ এবং সংখ্যালঘুদের ওপর হামলার মতো গুরুতর অপরাধের অভিযোগ রয়েছে।

পরবর্তীতে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে জামায়াতের তৎকালীন শীর্ষ নেতা মতিউর রহমান নিজামী, আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদসহ কয়েকজনকে দোষী সাব্যস্ত করে। এসব রায় ব্যক্তিগত অপরাধের বিচার হলেও, ১৯৭১ সালে দলটির নেতৃত্বের একটি অংশের ভূমিকা সম্পর্কে প্রতিষ্ঠিত ঐতিহাসিক মূল্যায়নকে আরও জোরালো করেছে।

সম্প্রতি জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা পরিষদ (সংশোধন) আইন, ২০২৬ পাসের মাধ্যমে সংসদ আবারও তৎকালীন জামায়াতে ইসলামী, মুসলিম লীগ, নেজামে ইসলাম পার্টি, রাজাকার, আলবদর, আলশামস ও শান্তি কমিটিকে পাকিস্তানি দখলদার বাহিনীর সহযোগী হিসেবে আইনি স্বীকৃতি বহাল রেখেছে। জামায়াতে ইসলামী এ বিধানের বিরোধিতা করেছে। অন্যদিকে বিএনপির কয়েকজন শীর্ষ নেতা, যেমন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ও সালাহউদ্দিন আহমদ, অভিযোগ করেছেন যে স্বাধীনতাবিরোধী অতীত থাকা সত্ত্বেও জামায়াত নিজেদের মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি হিসেবে উপস্থাপনের চেষ্টা করছে।

গণতান্ত্রিক সমাজে রাজনৈতিক দল পরিবর্তিত হতে পারে, তাদের আদর্শেরও রূপান্তর ঘটতে পারে। তবে সেই পরিবর্তনের পূর্বশর্ত হলো অতীত সম্পর্কে সততা ও জবাবদিহি। ইতিহাসকে অস্বীকার বা নতুনভাবে সাজিয়ে কোনো জাতি দীর্ঘমেয়াদে শক্তিশালী হতে পারে না। অতীতের ভুল স্বীকার করা মানেই স্থায়ী শাস্তি নয়; বরং তা ইতিহাসের নথিভুক্ত সত্যকে সম্মান জানানোর একটি উপায়।

এই বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ তরুণ প্রজন্মের জন্য। আজকের অধিকাংশ ভোটার মুক্তিযুদ্ধ প্রত্যক্ষ করেননি। তারা স্বাভাবিকভাবেই রাজনৈতিক দলগুলোকে বর্তমান নীতি, নেতৃত্ব ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার ভিত্তিতে মূল্যায়ন করবেন। তবে একই সঙ্গে একটি দলের অতীত এবং সেই অতীত সম্পর্কে তাদের অবস্থান জানা গণতান্ত্রিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্যও প্রয়োজনীয়। কারণ, যে দল নিজের প্রতিষ্ঠিত ইতিহাস নিয়েই স্পষ্ট অবস্থান নিতে পারে না, তাদের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিয়েও প্রশ্ন উঠতে পারে।

এ কারণেই শহীদ ও মুক্তিযোদ্ধাদের একটি নির্ভুল তালিকা প্রণয়ন কেবল প্রশাসনিক কাজ নয়; এটি জাতীয় ইতিহাস সংরক্ষণের একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। এমন একটি তালিকা ইতিহাস বিকৃতির সুযোগ কমাবে এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে বিভ্রান্তিকর রাজনৈতিক বয়ানের পরিবর্তে তথ্যভিত্তিক ইতিহাস জানার সুযোগ দেবে।

স্বাধীনতার জন্য যুদ্ধ করা প্রজন্ম ধীরে ধীরে বিদায় নিচ্ছে। ফলে ১৯৭১ সালের সত্য ও স্মৃতি সংরক্ষণের দায়িত্ব এখন ক্রমেই নতুন প্রজন্মের কাঁধে এসে পড়ছে। বাংলাদেশ গণতন্ত্র, রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা ও জাতীয় পুনর্মিলনের পথে এগোতে পারে, কিন্তু সেই যাত্রা কখনোই ঐতিহাসিক সত্য বিসর্জন দিয়ে হওয়া উচিত নয়। আর যতদিন পর্যন্ত জামায়াতে ইসলামী তাদের মুক্তিযুদ্ধবিরোধী প্রাতিষ্ঠানিক অবস্থান সম্পর্কে স্পষ্ট ও দ্ব্যর্থহীনভাবে আত্মসমালোচনা না করবে, ততদিন পর্যন্ত অনেক বাংলাদেশির মনে দলটির প্রতি আস্থা ও বিশ্বাসের প্রশ্ন থেকেই যাবে।



মন্তব্য করুন

সর্বশেষ খবর
এই বিভাগের আর খবর