রবিবার, ১৪ জুলাই ২০২৪ | ৩০ আষাঢ় ১৪৩১ বঙ্গাব্দ

রংপুর কারুপণ্য গ্রিন ফ্যক্টরি লিমিটেড যেন ‘সবুজ কর্মক্ষেত্র’

ইসরাত জাহান তানজু
২০ নভেম্বর ২০২০ ১৫:২৪ |আপডেট : ২৭ এপ্রিল ২০২১ ০০:৪০
কারুপণ্য ফ্যাক্টরিতে সবুজের সমারোহ। ফেসবুক থেকে নেওয়া
কারুপণ্য ফ্যাক্টরিতে সবুজের সমারোহ। ফেসবুক থেকে নেওয়া

ভাবুন তো এমন একটি ফ্যাক্টরির কথা-যেখান থেকে আর সব ফ্যাক্টরির মতো কালো ধোয়া বের হবে না, নোংরা দুর্গন্ধময় পানি বের হবে না। বের হবে না মারাত্মক পরিবেশ দূষণকারী রাসায়নিক বর্জ্য পদার্থ। যেই ফ্যাক্টরি কেবল সবুজে সবুজময়। সেখানে থাকবে নান্দনিক পার্ক, মন মাতানো পানির ফোঁয়ারা আর চোখ জুড়ানো সব ভাস্কর্য। যেখানে থাকবে কর্মচারী -শ্রমিকদের জন্য সবুজ গাছের ছায়ায় বেঞ্চে শুয়ে-বসে বিশ্রাম নেওয়ার সেই নস্টালজিক ব্যবস্থা। আধুনিক যান্ত্রিক জীবনের মাঝেও থাকবে গ্রামীণ জীবনের সেই প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের অপরূপ ছোঁয়া। এরপরও সেখানে থাকবে আধুনিকতার সকল সুযোগ-সুবিধা।

হ্যাঁ, এমন পরম সৌন্দর্যময় কারখানার কথা আপনাকে আর কল্পনার রাজ্যে থেকে চিন্তা করতে হবে না। এর বাস্তব অস্তিত্ব আপনি দেখতে পাবেন রংপুরের রবার্টসগঞ্জে। রংপুর স্টেশন রোডের ঘোড়াপীর মসজিদ সংলগ্ন ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজ পাশেই অবস্থিত এই দৃষ্টিনন্দন কারখানা। সৌন্দর্যের কারণে কারখানাটি ছুটির দিনে ভ্রমণ করতে আসে অনেক ভ্রমণপিপাসু মানুষ। কারখানাটির প্রতিষ্ঠাতা সফিকুল সেলিম। স্থপতি- বায়েজিদ এম খন্দকার।

শুরুর দিকের কথা

বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদ মরহুম এম এ সোবহানের  ছেলে সফিকুল সেলিম। বাড়ি রংপুরের গুপ্তপাড়ায়। তিন ভাই, তিন বোনের মধ্যে তিনি তৃতীয়। স্ত্রী সুরাফা হোসেন। বাবাকে রাজনীতি করতে দেখে ছোটবেলায় নিজেও জড়িয়ে পড়েন ছাত্র রাজনীতির সাথে। রাজনীতির দিকে অধিক মনোযোগী হওয়ায় ১৯৮০ সালে রংপুর ক্যাডেট কলেজে অষ্টম শ্রেণী থেকে নবম শ্রেণীতে উত্তীর্ণ হতে পারেননি সফিকুল সেলিম। এ কারণে ঘর থেকে বিতাড়িত হন। পরে নিজ চেষ্টায় ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজে ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নিয়ে প্রথম হন। এ কারণে পরবর্তী ক্লাসে বিনা টাকায় ভর্তির সুযোগ পান। কিন্তু রাজনীতি যে তার আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে। তাই এখানেও অন্যমনস্ক হয়ে পড়েন পড়ালেখার প্রতি। স্কুলে ফাঁকি দেওয়ার কারণে সেখানেও আর পড়তে পারলেন না। এরপর অন্য একটি স্কুল থেকে ১৯৮২ সালে এসএসসি ও ১৯৯১ সালে রংপুর সরকারি কলেজ থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞান নিয়ে অনার্স পাস করেন।

১৯৮৬ সালে ঢাকা শিল্পমেলায় একটি স্টল দিয়েছিলেন। দেশ ও বিদেশের নানান গুণীজন ও বরেণ্য ব্যক্তিবর্গের ছবি গম গাছের খড় দিয়ে বানিয়েছিলেন। ছিল মুক্তিযোদ্ধাদের ছবিও। এরকম দেড়হাজার ছবি বানিয়ে স্টলে টানিয়ে রেখেছেন। ভেবেছেন অনেক বিক্রি হবে। কিন্তু কোনো ক্রেতাকে আকৃষ্ট করতে না পারায় খানিকটা হতাশ হয়ে পড়েন।

                                             কারখানার কর্মমুখর পরিবেশ। ছবি : ফেসবুক

এরপর ক্রেতা আকৃষ্ট করার জন্য স্টলে টানিয়ে দেন -আপনি কি আপনার ছবি গমের শিষ দিয়ে বানাতে চান?? এরপরই একের পর এক অর্ডার পেতে থাকেন। দিনে গড়ে ১০টি করে অর্ডার পেতেন। ছবিগুলোর বিক্রয়মূল্যও বেশ ভালো পেতেন। মেলা শেষে রংপুরে ফিরে এসে ভাবতে থাকেন হস্তশিল্প নিয়েই তিনি কিছু একটা করবেন।

১৯৮৭ সালে এরশাদ সরকারের আমলে ছাত্ররাজনীতি করে গ্রেপ্তার হন। তিন মাস থাকতে হয় রংপুর জেলে। সেখানে কয়েদিদের হস্তশিল্প বুননের কাজ বিমুগ্ধু হয়ে দেখতেন। নিজেই অনেকটা রপ্ত করে ফেলেন এই কাজ। জেল থেকে বেড়িয়ে ঝুঁকে পড়েন সেই বুননের দিকে। পরিকল্পনা করেন হস্তশিল্পের একখানা কারখানা গড়ে তোলার।

তৎকালীন রংপুর প্রেসক্লাবের বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প সংস্থার  বন্ধ থাকা হস্তশিল্পের একটি দোকান ভাড়া নেন। সেখানে চালু করেন একখানা শতরঞ্জি বিপনন কেন্দ্র। হারিয়ে যাওয়া এই শতরঞ্জি শিল্পের সাথে জড়িত থাকা ২০ জন কারিগরকে তিনি খুঁজে বের করেন দেশের নানা প্রান্ত থেকে। তাদের দিয়ে প্রশিক্ষণ দিয়ে নতুন কারিগর তৈরী করেন। তাদের নিয়ে পুরোদমে শুরু করেন শতরঞ্জি বুননের কাজ। ১৯৯১ সালে গড়ে তোলেন কারুপণ্য নামে রংপুরের ঐতিহ্যবাহী শতরঞ্জি বিপননের দোকানটি।

দোকানকে কারখানায় রূপান্তর

প্রথম দিকে দোকানের আয় ছিল সীমিত। ক্রেতাদের অর্ডার অনু্যায়ী শতরঞ্জি বানানো হতো কারিগরদের দিয়ে। সেগুলোই সরবরাহ করা হতো। কিন্তু এত অল্প আয়ে সন্তুষ্ট হওয়ার পাত্র নন সফিকুল সেলিম। তাই নেমে পড়লেন পণ্য আর দোকানের প্রচারণায়। বেশ ভালো সাড়াও পেলেন। দেশের বিভিন্ন শিল্প ও বাণিজ্য মেলায় স্টল বসালেন। অর্ডার অনুযায়ী শতরঞ্জি বানিয়ে দেশের নানা জায়গায় সরবরাহও করলেন। একসময় ঢাকায় শতরঞ্জি নামের একটি প্রতিষ্ঠানও গড়ে তুললেন। অক্লান্ত প্রচেষ্টায় তার ব্যবসা সম্প্রসারিত হতে থাকে।

                                 কারখানার সামনে দাঁড়িয়ে আছে বনলতা ভাস্কর্য, ছবি : ফেসবুক

শতরঞ্জির বাজার তৈরি করতে তিনি হন্যে হয়ে ছুটতে থাকেন। বিদেশি ক্রেতাদের আকৃষ্ট করতে নানান দেশে প্রচারণা চালাতে থাকেন। সর্বপ্রথম ২০০২ সালে জাপানে এই পণ্য রপ্তানির সুযোগ পান। শতরঞ্জি নিয়ে তার ব্যবসায়িক চিন্তাভাবনা আরও বড় হতে থাকে। রংপুর শহর থেকে চার কিলোমিটার পশ্চিমে নিসবেতগঞ্জ গ্রামে বিসিকের বন্ধ থাকা একটি কারখানা ভাড়া নিয়েই শুরু করেন নিজ কারখানা। এখানকারই ৫০ জন নারী-পুরুষকে নিয়ে শতরঞ্জি বুনন শুরু করেন।

রংপুরে প্রতিষ্ঠানটির নাম দেন রংপুর ‘কারুপণ্য লিমিটেড। একে একে গড়ে তোলেন পাঁচটি কারখানা। বর্তমানে কারখানায় কর্মরত আছে সাত হাজার শ্রমিক। এই ২৯ বছরে কারখানাটির উন্নতি চোখে পড়ার মতো। ইউরোপ আমেরিকার ৩৬টি দেশে রপ্তানি হচ্ছে এই শতরঞ্জি। ২০১৮ সালে এই পণ্যের রপ্তানি আয় ছিল ১.৬০ কোটি মার্কিন ডলার যা বাংলাদেশি টাকায় প্রায় ১৩৬ কোটি টাকা।

কারখানাটির বিশেষত্ব

এ কারখানা যেন সবুজের রাজত্ব। চারদিকে কেবল সবুজের সমারোহ। সবুজ বাগানে নানা প্রজাতির গাছপালা-লতাপাতা, পাখির কলকাকলীতে মুখরিত হয়ে আছে পরিবেশ। ইট পাথরের দালান ছেয়ে আছে নানা প্রজাতির গাছপালা আর ফুল ফলে। দালান বেয়ে ঝুলছে লতাপাতা। ভবনের ছাদেও আছে বাগান। বাগানে আছে পার্ক। পার্কের নাম- নন্দিনী পার্ক। আছে গাছের ছায়ায় বসে বিশ্রাম নেওয়ার জন্য কারুকার্যখচিত বেঞ্চ। পানির ফোয়ারার মাঝে পদ্মফুলের কি যে অপরূপ শোভা, চোখে পড়ার মতো!

                                         নন্দিনী পার্কে বিশ্রাম নেওয়ার বেঞ্চ, ছবি : ফেসবুক

২০১৬ সালে রপ্তানি আয় ছিল ৩ কোটি ডলার। এই খাতে রপ্তানি বাণিজ্যের ৮০ শতাংশই হয় কারুপণ্য থেকে। এ কারণে ২০০৯ সাল থেকে প্রতিষ্ঠানটি বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের জাতীয় রপ্তানি ট্রফি জিতে আসছে। এই প্রতিষ্ঠানের ঝুলিতে আছে গোটা দশেক স্বর্ণপদক।

অব্যবহৃত কাঁচামালকে নবায়নকৃত করে সুতা তৈরির কাজে ব্যবহার করা হয়। সুতা তৈরির জন্য ১ বছরে ব্যবহার করা হয় কটন মিলের ৩ হাজার টন তুলার বর্জ্য। বছরে সাড়ে ৪ হাজার টন পাটের বর্জ্য, ১ হাজর ২০০ টন গার্মেন্টস ফ্যাক্টরির বর্জ্য -ঝুট কাপড় ব্যবহার করা হয় এই কারখানায়। এভাবে অব্যবহৃত পদার্থকে শতরঞ্জি তৈরির কাজে লাগিয়ে পরিবেশ আর প্রকৃতিকে বিপর্যয়ের হাত থেকে রক্ষা করছে কারখানাটি।

কারখানার দক্ষিণদিকে রয়েছে বিশাল বিশাল ৪টি জলাধার। এগুলোর ব্যসার্ধ ১৫০০০ বর্গফুট। প্রত্যেকটির ধারণক্ষমতা ৫ লাখ লিটার। এই পানি আয়রনমুক্ত। শতরঞ্জি ডাইংয়ের কাজে ব্যবহৃত হয় এই পানি। দক্ষিণমুখি হওয়ায় জলাধারগুলো কারখানায় পর্যাপ্ত আলোবাতাস চলাচল ও পরিবেশ শীতল রাখতেও উপকারী ভূমিকা পালন করে।

                    ডাইয়িংয়ের কাজে ও পরিবেশকে ঠান্ডা রাখতে ব্যবহৃত হয় জলাধার, ছবি : ফেসবুক

প্রতিটি তলার মেঝে থেকে ছাদের উচ্চতা রয়েছে ১২ ফুট। এতে গরম কিছুটা কম অনুভুত হয়। এ ছাড়া কারখানার প্রতি তলায় মেঝের মধ্যে যন্ত্র চালানোর ফলে গরম বাতাস বের হয়, সেই বাতাসও যেন ঘরের ভেতর ঘুরপাক না খায় এ জন্য মেঝের মধ্যে প্রতিটি যন্ত্রের নিচে ফুটো রয়েছে। মেঝের মধ্যে এসব ফুটো দিয়ে গরম বাতাস একটি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে জানালার ওপরের ভেন্টিলেটর দিয়ে বের হয়ে যায়। দশ তলা ভবনের তিনতলা আছে আন্ডারগ্রাউন্ডে আর বাকি সাততলা ওপরে।

এই কারখানার অধিকাংশ (৯০ শতাংশ) শ্রমিক নারী। কারখানার সামনে নারীর প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়ে আছে একটি শুভ্র ভাস্কর্য, যেটির নাম বনলতা সেন। যার উচ্চতা প্রায় ৩০ ফুট। এছাড়াও আছে উন্মুক্ত মঞ্চ। বিশেষ দিনে আয়োজিত অনুষ্ঠানগুলো এখানে বসেই উপভোগ করেন শ্রমিকরা। রয়েছে বিনামূল্যে চিকিৎসা সেবার ব্যবস্থা, ব্যাংকিং সুবিধা, এটিএম বুথ। মনোরম পরিবেশে খাবারের ক্যান্টিন, নারী শ্রমিকদের জন্য চাইল্ড কেয়ার সেন্টার, যেখানে বিনামূল্যে শ্রমিকদের শিশুদের দুধ ও খাবার দেওয়া হয়। রয়েছে নামাজের বিশেষ ব্যবস্থা।

এমন সবুজ পরিবেশ কারখানায় পর্যাপ্ত আলো-বাতাস প্রবেশে নিশ্চিত করেছে। কোনো ধরনের এয়ার কন্ডিশনিংয়ের ব্যবস্থা না থাকলেও তাপমাত্রায় সবসময় ১৮°সেলসিয়াসের কাছাকাছি থাকে। এটি কারখানার বিদ্যুতের অপচয় অনেকাংশে রোধ করেছে।

শেষ কথা

১০০ ভাগ ইকো ফ্রেন্ডলি এই কারখানা। শুধু দেখতেই সুন্দর না কর্মীদের চিকিৎসা, দুপুর ও রাতের খাবার, শিশুদের দেখাশোনা, তাদের বাজার থেকে শুরু করে সবকিছুর সুবিধা আছে এখানে। এটি দেশে আয়ের পাশাপাশি বৈদেশিক মুদ্রা উপার্জনেরও বড় উৎস। একইসাথে বড় সংখ্যাক মানুষের কর্মসংস্থানেরও সুযোগ তৈরি করে দিয়েছে এই কারখানা। হারিয়ে যাওয়া শতরঞ্জি শিল্পকে আবার পুনরুজ্জীবিত করে দেশের ইতিহাস-ঐতিহ্যকে নতুন রূপে সংরক্ষণ করছে কারখানাটি। পরিবেশ দূষণ ও জলবায়ুর ওপর এর ক্ষতিকর প্রভাবের কারণে যেখানে বাংলাদেশ তথা আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নানা পদক্ষেপ নেওয়ার পরও এর বাস্তবায়ন ও নিয়ন্ত্রণ সম্ভব হচ্ছে না, সেখানে এধরনের পরিবেশবান্ধব কারখানা সত্যিই জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে একটি দৃষ্টান্ত।



মন্তব্য করুন